ডেঙ্গু শক সিনড্রোম – লক্ষনসমূহ, করনীয়, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা।

ডেঙ্গু জ্বর : লক্ষনসমূহ, হলে করনীয়, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

ডেঙ্গু জ্বর হচ্ছে এডিস মশা দ্বারা একধরনের জীবাণু বাহিত রোগ। যে এডিস মশা ডেঙ্গু ভাইরাসের জীবাণু বহন করছে না এমন সাধারণ এডিস মশা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত কোন ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই এডিস মশাটিও ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। সেই ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত এডিস মশাটি যখন আরেকজন সু্‌স্থ্ মানুষকে কামড় দেয় তখন সেই সু্‌স্থ্ মানুষটিও ডেঙ্গুরোগে আক্রান্ত হয়।

ডেঙ্গু জ্বর হচ্ছে এডিস মশা দ্বারা একধরনের জীবাণু বাহিত রোগ। যে এডিস মশা ডেঙ্গু ভাইরাসের জীবাণু বহন করছে না এমন সাধারণ এডিস মশা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত কোন ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই এডিস মশাটিও ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। সেই ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত এডিস মশাটি যখন আরেকজন সু্‌স্থ্ মানুষকে কামড় দেয় তখন সেই সু্‌স্থ্ মানুষটিও ডেঙ্গুরোগে আক্রান্ত হয়।

সাধারণত যেসব অঞ্চলে গরম বেশি, শহর অঞ্চলের মানুষদের ডেঙ্গু জ্বর রোগে বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যায়। সাধারণত যারা আগেও ডেঙ্গুজ্বর রোগে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে থাকে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গুজ্বর রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

ডেঙ্গু জ্বর : লক্ষনসমূহ, হলে করনীয়, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা
ডেঙ্গু জ্বর : লক্ষনসমূহ, হলে করনীয়, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

ডেঙ্গু জ্বর হচ্ছে একধরনের জীবাণু বাহিত রোগ। হাল্কা বা মৃদু ডেঙ্গু জ্বর থেকে মারাত্মক ধরনের ডেঙ্গু জ্বর হতে পারে। মৃদু ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে তীব্র জ্বর, মাংসপেশী ও হাড়ে ব্যথা হওয়া এবং শরীরে লালচে দানা দেখা দিতে পারে। ডেঙ্গুজ্বর এর নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই এবং অধিকাংশ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীই সুস্থ হয়ে যায়। ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রোম জ্বরে আক্রান্ত রোগীর মারাত্মক রক্তক্ষরণ, রক্তচাপ কমে যাওয়া, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। মারাত্মক ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হলে রোগীকে অবশ্যই হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করতে হবে।

সাধারণত জ্বরের লক্ষণ দেখেই ডাক্তাররা বুঝতে চেষ্টা করেন রোগীর ডেঙ্গুজ্বর হয়েছে কিনা, এছাড়া রক্ত পরীক্ষা করে ডেঙ্গুজ্বর রোগের ধরন ও মাত্রা বুঝতে পারে। ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ বিস্তারিতভাবে জেনে নিন।

এক ধরনের জীবাণু দিয়েই কেবল ডেঙ্গুজ্বর হয়। এডিস নামে এক ধরনের মশা কেবল এই রোগের জীবাণু বহন করতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বর রোগে আক্রান্ত হলে সাধারণত: 

  • ডেঙ্গুজ্বর রোগের জীবাণুতে আক্রান্ত হওয়ার পরের কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর্যন্তও কোন কোন বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে অবসন্নতা, ক্লান্তিবোধ দেখা দিতে পারে।
  • মারাত্মক ডেঙ্গুজ্বর থেকেই ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম জ্বর হতে পারে। এর ফলে যে সমস্যা গুলো হতে পারে সেগুলো হলো-অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত পড়া, শক এমনকি এ ধরনের সমস্যা থেকে রোগীর মৃত্যু হতে পারে।
  • অনেকসময় ডেঙ্গুজ্বর থেকে সু্‌স্থ্ হলেও অনেকের যকৃত, রক্তনালী বা মস্তিস্কের ক্ষতি হতে পারে।

———————–

প্রাথমিক অবস্থায় ডেঙ্গু জ্বরে নিম্নে বর্ণিত লক্ষণসমূহ পরিলক্ষিত হয়, তবে রোগের ধরণ অনুযায়ী আরও জটিল অবস্থা ধারন করলে আরও কিছু উপসর্গ যোগ হতে পারেঃ

  • তীব্র জ্বর-১০৫ ফারেনহাইট(৪০.৬ সে.) পর্যন্ত। জ্বর আসার ২-৫ দিন পর গায়ে লাল লাল র‍্যাশ উঠবে (petechiae, purpura, echymosis)
  • গায়ে প্রচন্ড ব্যাথা। এই গায়ে বলতে, মাংসে ব্যাথা, মাথায় ব্যাথা, চোখের পিছে ব্যাথা, গিড়ায় গিড়ায় ব্যাথা, হাড্ডিতে ব্যাথা, এই ব্যাথাটা একটু বেশি থাকে তাই একে breakbone fever ও বলে।
  • ডেঙ্গুজ্বরে সারা শরীরে লালচে দানা দেখা দেয় যা কিছুদিনের জন্য চলে গিয়ে পুনরায় ডেঙ্গুজ্বর এর লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয়।
  • ডেঙ্গুজ্বর এর লক্ষণ হিসেবে অস্থি সন্ধি এবং মাংসপেশীতে তীব্র ব্যথা অনুভব হয়
  • ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গ হিসেবে চোখের পিছনে ব্যথা।
  • বমি বমি ভাব এবং বমি করাও ডেঙ্গুর লক্ষণ।

হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গ

উপরিউক্ত মৃদু ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গের সাথে আরো কিছু সমস্যা হয় ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরের ক্ষেত্রে

  • রোগীর দেহে রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্যকারী রক্ত কোষের সংখ্যা কমে যেতে থাকে।যার ফলে রোগীর দেহে চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণ হয় এবং নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়।
  • অনেক সময় ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরের ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
[বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ ডেঙ্গুজ্বরের যে কোন লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা দেয়ার সাথে সাথে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।]

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম ডেঙ্গুজ্বরের সবচেয়ে মারাত্মক ধরন। এই ডেঙ্গুজ্বরে মৃদু ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গের সাথে পাশাপাশি অন্যান্য আরও কিছু সমস্যা দেখা দেয়।

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গ

  • ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর তীব্র পেটে ব্যথা হয়।
  • ডেঙ্গুজ্বর এর লক্ষণ হিসেবে রোগীর ঘন ঘন বমি হওয়া।
  • ডেঙ্গুর লক্ষণ হচ্ছে জ্ঞান হারানো।
  • ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়া।
  • ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ হচ্ছে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া।

এতে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

————————————————-

ডেঙ্গু জ্বরে করনীয় কাজ বা ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা করার আগে প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে কিনা। জ্বরের লক্ষণ দেখে, পাশাপাশি রক্ত পরীক্ষা করে ডাক্তাররা বুঝতে চেষ্টা করেন ডেঙ্গু হয়েছে কিনা। রক্ত পরীক্ষা করলে ডেঙ্গুজ্বর রোগের ধরন ও মাত্রা বুঝা হয়। এক ধরনের জীবাণু দিয়ে ডেঙ্গুজ্বর হয় আর এডিস মশা এই রোগের জীবাণু বহন করে।

সাধারণত শহর অঞ্চলে ডেঙ্গুজ্বর রোগ বেশি লক্ষ্য করা যায়। এমনকি যেসব অঞ্চলে বেশি গরম পড়ে সেসব অঞ্চলের মানুষ ডেঙ্গুজ্বরে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। এছাড়া যারা পূর্বেও ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে এই রোগে আবার মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হলে যেসব জটিলতা দেখা দেয়

  • ডেঙ্গুজ্বর থেকে সুস্থ হওয়ার পরও কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর্যন্ত বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে ক্লান্তিবোধ, অবসন্নতা লক্ষ্য করা যায়।
  • মারাত্মক ডেঙ্গুজ্বর থেকে ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম জ্বর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এর ফলে যে সকল সমস্যা হতে পারে তাহলো-অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ,শক এমনকি এ ধরনের সমস্যা থেকে মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে।
  • অনেকসময় সু্‌স্থ্ হবার পর অনেকের যকৃত, রক্তনালী এমনকি মস্তিস্কের ক্ষতি হতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বরে করনীয় ও ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা

  • পূর্ণ বিশ্রাম।
  • জ্বরের জন্য শুধুমাত্র paracetamol. শরীর মুছে ঠান্ডা করবেন। (জ্বর কমাতে কোন aspirin জাতীয় ওষুধ কখনোই দেওয়া যাবে না, দিলে platelet আরো কমে যাবে, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে aspirin দিলে Reyes syndrome ডেভেলপ করতে পারে।
  • জ্বরের কারণে রোগীর dehydration থাকে, তাই প্রচুর তরল খাবার খাওয়াবেন। আর রোগীর hypovolumia বা শকের কোন ফিচার ডেপেলপ করলে আইভি ফ্লুইড (normal saline) দিতে হবে হসপিটালাইজ করে।
    – যেহেতু platelet count কমে যায়, তাই platelet transfusion করতে হবে৷
  • বেশি বেশি করে তরল জাতীয় খাদ্য গ্রহন করবেন।
  • ডেঙ্গুজ্বর থেকে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করা।
  • ডেঙ্গুজ্বর রোগীকে প্রয়োজন হলে শিরাপথে স্যালাইন দিতে হবে।
  • ডেঙ্গুজ্বর রোগীকে রক্ত ঘাটতি পূরণের জন্য রক্ত দেওয়া।
  • বাড়তি পথ্য ও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
  • বমি এবং জ্বর থেকে যাতে পানিশূণ্যতা না হয় তার জন্য রোগীকে বেশি বেশি করে খাবার স্যালাইন ও অন্যান্য তরল খাবার খেতে দিবেন।
  • আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই মশারীর ভিতর রাখতে হবে।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই নিজে থেকে কোন ব্যথানাশক ঔষধ খাবেন না, তাতে ডেঙ্গুজ্বরের জটিলতা বরং বেড়ে যেতে পারে।

——

১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর, তিব্র মাথা ও পিঠ ব্যথা, সারা শরীরে লালচে দানা, মাংসপেশি ও চোখের পিছনে ব্যথা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি লক্ষণ সাধারনত ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে দেখা যায়। ডেঙ্গুজ্বর এডিস মশা দিয়েই হয়। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত কোন রোগীকে কোন এডিস মশা কামড়ালে সেই এডিস মশাটিও ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যায়। এই মশাটি যখন আরেকজন সু্‌স্থ্ ব্যক্তিকে আবার কামড় দেয় তখন সু্‌স্থ্ মানুষটিও ডেঙ্গুরোগে আক্রান্ত হয়। তাই, ডেঙ্গু রোগ বাহিত মশা থেকে সতর্ক থাকলেই শুধুমাত্র ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধে আমাদের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে নিম্নলিখিত কাজগুলো করতে হবেঃ

  • দিনের বেলায় এডিস মশা কামড়ায়। তাই দিনের বেলা ঘুমাতে চাইলে মশারী টাঙিয়ে অথবা কয়েল জ্বালিয়ে নিতে হবে।
  • ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই মশারীর মধ্যে রাখতে হবে যাতে পুনরায় রোগীকে কোন মশা কামড়াতে না পারে।
  • নিজ দায়ীত্বে বাড়ির আশেপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
  • বাড়ির আশেপাশে এমন কোন অব্যবহৃত জিনিস রাখা যাবেনা যাতে পানি জমতে পারে। যেমনঃ ভাঙ্গা ফুলের টব, অব্যবহৃত কৌটা, ভাঙ্গা ফুলদানি, ভাঙ্গা বেসিন, অব্যবহৃত টায়ার, ডাবের খোসা, মুখ খোলা পানির ট্যাঙ্ক, প্লাস্টিকের প্যাকেট, পলিথিন ইত্যাদি।

পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমান সময়ে ডেঙ্গু জ্বরের উপদ্রপ অনেক বেড়েছে। একটু সতর্কতার সাথে থাকলে আর বাড়ি, বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার পরিছন্ন রাখলে আর ভালভাবে ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায় জানা থাকলে খুব সহজেই ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধ করা যায়।

যেহেতু এডিস মশার কামড়ে এই রোগ হয়, তাই এর একমাত্র প্রতিরোধ হলো ‘যেখানে দেখিবেন মশা, দিবেন জোরসে ঘষা!’ হয় মশা সব মারবেন, না হয় মশা থেকে পাঁচশ হাত দূরে থাকবেন। মনে রাখবেন এই ভয়ংকর সন্ত্রাসী এডিস মশা শুধু ডেঙ্গুই না চিকুনগুনিয়া ভাইরাস, জিকা ভাইরাস, ইয়োলো ফিভার ভাইরাস এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়ায়। তাই যেখানেই দেখিবেন মশার বংশ, মেরে করবেন নির্বংশ। আশপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখবেন। আর আমার মত সারা বছর মশারি টাঙিয়ে রাখবেন, বারবার টাঙানোর ঝামেলা নাই।

error: Alert: Content Copying is protected !!