রসুনের উপকারিতা, অপকারিতা এবং সঠিক ব্যবহার জেনে নিন ।

রসুনের উপকারিতা ও অপকারিতা

সুন প্রায় প্রত্যেকের রান্নাঘরেই এক আবশ্যকীয় উপকরণ। বিশেষ স্বাদ ও গন্ধের জন্য এটি রান্নায় একটি বিশেষ ফ্লেভার সৃষ্টি করে। যেকোনো আমিষ রান্নায় যেমন মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদিতে ও বিশেষ কিছু সবজি বা তরকারি রান্নায় রসুন ব্যবহার করা হয়। আপনি জানেন কি যে রসুনের গুণ শুধু রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ নয় ? রসুন খাওয়ার উপকারিতা নানা রকম ভাবে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। আজ জেনে নিন রসুন ও রসুনের উপকারিতা নানা তথ্য। খালি পেটে রসুন খাওয়ার উপকারিতা হার্টের ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে দেখা যায়। রোজ সকালে খালি পেটে এক কোয়া রসুন চিবিয়ে খান, উপকার নিশ্চয়ই পাবেন।

রসুনের উপকারিতা 

  1. ওজন কমানোর জন্যে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ কোয়া রসুন খাওয়ার অভ্যেস করুন। শরীরের এডিপোস কোষগুলিকে রসুনের দ্বারা শক্ত করে এঁটে রাখা যায় যার ফলে উচ্চ পরিমানে থার্মোজেনেসিস নিঃসরণ হয়। এর ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই ওজন কমতে শুরু করে ও কোলেস্টরলও নিয়ন্ত্রনের মধ্যে চলে আসে।
  2. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রতিদিন ২ কোয়া কাঁচা রসুন চিবিয়ে খাওয়ার অভ্যেস করুন। রসুনে রয়েছে সালফার যা জৈব পদার্থে ভরপুর ও এস-এলিলসিস্টিন। এই দুটোই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে অর্থাৎ উচ্চ রক্তচাপ প্রায় সিস্টোলিকে ১০ mmHg ও ডায়াস্টোলিকে ৮ mmHg কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। শরীরে সালফারের পরিমাণ কম হলেই রক্তচাপ বাড়তে শুরু করে।
  3. রসুনের সাপ্লিমেন্ট বা কাঁচা রসুন খেলে ফ্লু এবং কমন কোল্ড তাড়াতাড়ি সেরে যায় | এর কারণ রসুন খেলে ইমিউন সিস্টেমের কার্যক্ষমতা অনেকটা বেড়ে যায় |
  4. ডায়বেটিস‚ উচ্চ রক্তচাপ এবং হার্ত সংক্রান্ত ডিজিজ কন্ট্রোলে রাখুন : বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে কিডনির সমস্যা তখনই হয় যখন ডায়বেটিস‚ উচ্চ রক্তচাপ বা হার্ট সংক্রান্ত রোগ থাকে | দেখা গেছে ৫০% ব্যাক্তি যাদের ডায়বেটিস আছে তারা কিডনির রোগে আক্রান্ত হয়েছেন | অন্যদিকে যাদের রক্তচাপ ১৪০/৯০ এর ওপরে তাদের ক্রনিক কিডনি ডিজিজ হওয়ার সম্ভবনা অনেক বেশি | তাই রক্তে চিনির পরিমাণ এবং রক্তচাপ ঠিক রাখা খুব জরুরী | ৪০ বছরের ওপরে বছরে একবার অবশ্যই হেল্থ চেক আপ করান |
  5. রসুনের সাপ্লিমেন্ট বা কাঁচা রসুন খেলে ফ্লু এবং কমন কোল্ড তাড়াতাড়ি সেরে যায় | এর কারণ রসুন খেলে ইমিউন সিস্টেমের কার্যক্ষমতা অনেকটা বেড়ে যায় |
  6. যেহেতু রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে তাই ক্রনিক ডিসিজ কম হয় | ফলে আপনার দীর্ঘজীবি হওয়ার সম্ভবনা অনেকেটা বেড়ে যায়
  7. রসুন পরিপাকক্রিয়া উন্নত করতে সাহায্য করে। সকালে এক কোয়া রসুন খেতে পারলে শরীর থেকে ক্ষতিকারক বিষাক্ত পদার্থ বের করে দিতে পারে এটি।
  8. কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে থাকে এই রসুন।গলব্লাডার ক্যান্সার হওয়া থেকেও মুক্ত রাখে। মেয়েদের স্তন ক্যান্সারের ঝুকি কমায়। এমনকি রেক্টাল ক্যান্সারের হাত থেকে রক্ষা করে। রসুন প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। এই রসুন ইস্ট ইনফেকশন দূর করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া নিয়মিত রসুন সেবনে শরীরে সব ধরনের ক্যানসার প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়।
  9. ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুঘটিত রোগ প্রতিরোধে হাজার বছর ধরেই রসুন ব্যবহৃত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের কৃমি দূর করতে রসুনের নির্যাস ভালো কাজ করে। রসুনের নির্যাস থেকে ‘মাউথ ওয়াশ’ (মুখের ভেতর পরিষ্কারের তরল) তৈরি করা যায়। এটি নিয়মিত ব্যবহারে মাড়িতে ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার বন্ধ হয়ে যায়।
  10. ২০ শতকের মাঝামাঝি এসে একে অ্যান্টিবায়োটিকের সাথে তুলনা করা হয়। মধুকে সংক্রমণ প্রতিরোধী উপাদান হিসেবে ধরা হয়। এই দুটো চমৎকার জিনিস যখন একসাথে হয় তখন এর গুণ বেড়ে যায় আরো বেশি।রসুন ও মধুর মিশ্রণ বিভিন্ন ধরনের  সংক্রমণ, ঠান্ডা, জ্বর, কফ ইত্যাদি সারাতে বেশ ভালো কাজ করে। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কেবল সাতদিন রসুন ও মধুর মিশ্রণ খেলে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে শরীরকে অনেকটাই রক্ষা করা যায়।

রসুনের অপকারিতা

১. কাঁচা রসুনের একটি তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে যা খেলে বেশ খানিক্ষণ মুখে লেগে থাকে ও দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। এমনকি, হাত দিয়ে ছাড়ানোর সময়ও রসুনের গন্ধ বেশ খানিক্ষণ হাতে লেগে থাকে।

২. বেশি পরিমাণ কাঁচা রসুন খেলে বুকে জ্বালাভাব ও ব্যাথার অনুভূতি হয়, যার ফলে বমি পেতে পারে।

৩. অত্যাধিক কাঁচা রসুন খাওয়ার ফলে গ্যাসের সমস্যা দেখা দেয়। এমনকি, পেটে জ্বালাভাব, ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে।

৪. কাঁচা রসুন বেশি খেলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাতে পারে যার ফলে খুব ঘাম হয়।

৫. মাইগ্রেন বা অত্যাধিক মাথা ধরার সমস্যা থাকলে কম রসুন খাওয়াই ভাল। বেশি পরিমাণ কাঁচা রসুন খেলে মাইগ্রেনের সমস্যা বেড়ে যায়।

৬. অত্যাধিক রসুন খাওয়ার ফলে দৃষ্টি শক্তির ওপর প্রভাব পড়ে। এর ফলে চোখের ভেতরে রক্তপাত বা হাইফেমার মত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৭. রসুন উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে, কিন্তু বেশি রসুন খেলে রক্তচাপের মাত্রা অতিরিক্ত কমে যেতে পারে।

৮. বেশি রসুন খেলে ত্বকে চুলকানি, লালচে ভাব, ঘামাচি বা শুস্কতা দেখা দেয়।

৯. কম রসুন খেলে যোনির ইনফেকশন যদিও কমে যায়, কিন্তু বেশি খেলে তা আবার বেড়ে যায় ও যোনিতে দুর্গন্ধের কারণ হতে পারে।

১০. অত্যাধিক রসুন খাওয়ার ফলে লিভারে বিষাক্ত ক্রিয়াকলাপ সৃষ্টি হতে পারে যা আপনার লিভারের কার্যকলাপকে নষ্ট করে দিতে পারে।

 রসুন খুব নিউট্রিসাস‚ কিন্তু এতে খুব কম ক্যালোরি আছে :

১ আউন্স বা ২৮ গ্রাম রসুনের মধ্যে রয়েছে :

মান্গানেসে : 23% of the RDA.
ভিটামিন  B6: 17% of the RDA.
ভিটামিন  C: 15% of the RDA.
সেলেনিউম্ : 6% of the RDA.
ফাইবার : 1 gram.

এছাড়াও রসুনের মধ্যে পাওয়া যায় ক্যালসিয়াম‚ কপার‚ পটাশিয়াম‚ ফসফরাস‚ আয়রন এবং ভিটামিন B1 |

 

সতর্কবার্তা:

রসুন যত উপকার ততটা ক্ষতিকর।দিনে ২ কোয়ার বেশি কাঁচা রসুন খাওয়া যাবে না। রান্নায় এটি ব্যবহার হলেও দিনে মাত্র ২ কোয়া রসুন ব্যবহার করতে হবে । যাদের রসুন খাওয়ার ফলে এলার্জি হবার আশঙ্কা থাকে বা হয় তাদেরকে অবশ্যই কাঁচা রসুন খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। যাদের রসুন খাওয়ার ফলে মাথা ব্যথার সমস্যা হয়, বমির প্রাদুর্ভাব হয় বা অন্য কোন সমস্যা দেখা দেয় তাদের জন্য কাঁচা রসুন না খাওয়াই ভাল। আবার অতিরিক্ত খেলে নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ হতেও পারে তাই বেশি রসুন খাওয়া ঠিক নয়।

অনেকের শরীর থেকে রক্তপাত সহজে বন্ধ হয় না, অতিরিক্ত রসুন খাওয়া তাদের জন্য বিপদ জনক। কারণ, রসুন রক্তের জমাট বাঁধার ক্রিয়াকে বাধা প্রদান করে। ফলে রক্তপাত বন্ধ হতে অসুবিধা হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রসুন না খাওয়াই উত্তম। রসুন খাওয়ার ফলে পাকস্থলীতে অস্বস্তি বোধ করলে রসুন খাওয়া বন্ধ রাখতে হবে। শিশুকে দুগ্ধদানকারী মায়েদের রসুন না খাওয়াই ভাল। কারণ রসুন খাওয়ার ফলে তা মায়ের দুধের মাধ্যমে শিশুরপাকস্থলীতে ঢুকে শিশুর যন্ত্রণার কারণ ঘটাতে পারে।অনেকের রসুনের গন্ধ সহ্য হয় না। এখন রসুনকে ঔষধের বড়ি হিসেবে তৈরি করার জন্য তাদের সুপারিশ করা হয়েছে। রসুন নরম হয়ে গেলে বা সবুজ রঙ দেখা দিলে সেই রসুন কিনবেন না। কারণ এসব রসুনের কার্যগুন নষ্ট হয়ে যায়। কেনার সময় মাঝারি আকারের রসুন কিনতে হবে।রসুন বন্ধ পাত্রে না রেখে খোলা পাত্রে রাখা ভাল। ভুলেও রেফ্রিজারেটরে রসুন রাখবেন না। এতে করে রসুন নরম হয়ে যাবে।নরম রসুন স্বাস্থ্যকর নয়। ভাজার জন্য বা কারি পেস্টের  জন্য রসুন ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

error: Alert: Content Copying is protected !!