নবজাতকের জন্ডিস কেন হয়

প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরে যে রক্ত হয়, সে রক্তটা ভেঙ্গে গিয়ে নতুন রক্ত তৈরি হয়। এখান থেকে বিলুরুবিন বের হয়। এর রংটা হলুদ। এর পরিমাণ যখন বেড়ে যায় তখনই জন্ডিস হয়। নবজাতকের যখন এটি হয়, তখন আমরা একে নবজাতকের জন্ডিস বলি।

নবজাতকের জন্ডিস একটি প্রচলিত সমস্যা। জন্মের পর অনেক শিশুরই জন্ডিস হয়ে থাকে। নবজাতকের রক্তে উচ্চ বিলিরুবিন মাত্রার কারণে এ জন্ডিস হয়। ৬০ শতাংশ পূর্ণ গর্ভকাল (টার্ম) নবজাতকের এবং ৮০ শতাংশ প্রি-টার্ম অর্থাৎ অকালজাত নবজাতকের মধ্যে প্রথম সপ্তাহে জন্ডিস দেখা যায়। তবে এর বেশির ভাগই নির্দোষ জন্ডিস যা সাধারণভাবে চলে যায়, যাকে ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস বলে।

নবজাতকের জন্ডিসঃ

নবজাতকের জন্ডিস বলতে সাধারণত বুঝি, তার চোখ হলুদ হয়ে যাবে। সম্পূর্ণ শরীর হলুদ হয়ে যাবে। হলুদ বর্ণ ধারণ করার একটি কারণ হচ্ছে, শরীরে লোহিত রক্ত কণিকার একটি উপাদান থাকে, যার নাম হচ্ছে বিলুরুবিন, এই বিলিরুবিনের মাত্রা যখন বাড়ে, উৎপাদন যখন বেড়ে যায় অপাসারণের তুলনায়,  তখনই হলো রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যায়। আর বাচ্চার শরীরে জন্ডিস দেখা যায়। তখন আমরা একে নবজাতকের জন্ডিস বলি।

নবজাতকের জন্ডিস কী কী ধরনের হয়?

নবজাতকের সাধারণত দুই ধরনের জন্ডিসের কথা আমরা বলি। এর মধ্যে একটি হলো সাধারণ জন্ডিস। একে ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস বলা হয়। এটি সাধারণ জন্ডিস। আরেক ধরনের জন্ডিস হয়, এটি প্যাথোলজিক্যাল জন্ডিস। অথবা মারাত্মক জন্ডিস বলা হয়।

সাধারণ জন্ডিস কী?

শতকরা ৬০ ভাগ পরিণত শিশু ও শতকরা ৮০ ভাগ অপরিণত শিশুর জন্মের পর পর জন্ডিস হয়। কারণ হিসেবে দেখা যায়, নবজাতকের লিভার অপরিপক্ক থাকে। এবং নবজাতকের সময়কাল একটু স্বল্প থাকে। এই লোহিত রক্ত কণিকার আকার একটু বেশি থাকে। এই জন্য বিলিরুবিন উৎপাদন বেশি হয়। লিভার অপরিপক্ক থাকার কারণে, একে শরীর থেকে বের করতে পারে না। এই জন্য নবজাতকের সাধারণ জন্ডিস হয়ে থাকে। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে বাচ্চার কোন শারীরিক কন্ডিশনের কারণে জন্ডিস দেখা দিতে পারে। এগুলো হলো-

হেমোলাইটিক এনিমিয়াঃ এ ক্ষেত্রে নবজাতকের শরীরে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। তার লিভার এবং প্লীহা বড় হয়ে যায় এবং চোখ হলুদাভ হয়ে যায়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে নবজাতকের লিভার ফেইলিওর অথবা লিভার সিরোসিস হতে পারে। এক্ষেত্রে শিশুর মৃত্যুও হতে পারে।

প্রি ম্যাচিউর শিশুর জন্মঃ অপরিণত অবস্থায় জন্ম হলে নবজাতকের জন্ডিস হতে পারে। মাত্রা বেশি হলে (১৪ মি.গ্রা./ ডেসিলিটারের বেশি) ফটোথেরাপি দিতে হবে আবার জন্ডিসের মাত্রা কম হলে (১৪ মি.গ্রা./ ডেসিলিটারের নিচে) সূর্যের আলোতেই ভালো হয়ে যায়।

রক্তের গ্রুপের মিস-ম্যাচঃ মা ও শিশুর রক্তের গ্রুপ যদি ভিন্ন হয়।বিশেষ করে মায়ের রক্তের আরএইচ নেগেটিভ হলে এবং বাচ্চার আরএইচ পজেটিভ হলে এই জন্ডিস খুব দ্রুত বাড়তে থাকে। কারণ মায়ের শরীরের এন্টিবডি শিশুর রক্তের কোষগুলোর গ্রুপ ভেঙে দেয়। এ, বি বি, ও গ্রুপের মাঝেও এটা দেখা দিতে পারে। মায়ের ও গ্রুপ আর বাচ্চার এ অথবা বি হলেও এটা হতে পারে।

G-6-P-D অপ্রতুলতাঃ এ অ্যানযাইমটি লোহিত রক্তকণিকার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রন করে। এর অপ্রতুলতার কারনেও নবজাতকের জন্ডিস দেখা দিতে পারে।

ইনফেকশনের কারনেঃ নবজাতকের রক্তে ইনফেকশন ছড়িয়ে গেলে একে সেপটিসেমিয়া বলা হয়। এটি হলে জন্ডিসও হয়। ইনফেকশন যেমন হেপাটাইটিস বা সিস্টিক ফাইব্রোসিস এর মত রোগ থাকলে শিশুর লিভার ঠিকমত কাজ করতে পারেনা ফলে জন্ডিস দেখা দিতে পারে।

 

ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিসঃ শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানোর (এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং) ফলে শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ কোন কোন নবজাতকের জন্মের পর চতুর্থ দিন থেকে জন্ডিস দেখা দিতে পারে। একে বলে ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস। প্রতি একশ জনে এক জন নবজাতকের ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস হতে পারে। এই ধরণের জন্ডিসে জন্মের পর চতুর্থ দিন থেকে সপ্তম দিনে গিয়ে রক্তে বিলিরুবিন সর্বোচ্চ মাত্রায় বেড়ে তারপর কমতে শুরু করে। এক থেকে দুই মাস পর্যন্ত অল্প মাত্রার জন্ডিস থেকে যেতে পারে। তবে এটি শরীরের কোন ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় না।

 

সাধারণ জন্ডিস হয়ে থাকলে করণীয় কী?

সাধারণ জন্ডিসটা দুই থেতে তিন দিনের দিন আসবে। এটা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকবে। এরপর নিজে থেকেই এটা কমে আসবে। পাঁচ থেকে ছয় দিন পর্যন্ত এটি বাড়তে থাকবে। পরে নিজে থেকেই এটা কমে আসবে। ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে এটি ভালো হয়ে যায়। তবে কোনো কোনো কারণে এটি বেড়ে যেতে পারে। যেমন নবজাতক যদি খাবার ঠিকমতো না পায়, কিংবা নবজাতকের যদি স্বল্প ওজন হয়ে থাকে, অপরিণত হয়ে থাকে, তাহলে এটা সাধারণত একটু বেড়ে যায়। সেই ক্ষেত্রে যেটি করতে হবে খাবার খুব ঘন ঘন দিতে হবে তাকে। মায়ের বুকের দুধ তাকে ঘন ঘন খাওয়াতে হবে। এ ছাড়া যদি জন্ডিস বাড়তে থাকে, তাহলে ক্রমশই বাড়বে। কম জন্ডিসে প্রথমে মুখ হলুদ হবে, এরপর যত বাড়তে থাকবে, বুকে নামবে, পেটে নামবে, পায়ে নামবে। হাতের তালু, পায়ের তালু পর্যন্ত চলে যেতে পারে। সেসব ক্ষেত্রে জন্ডিসের মাত্রা নিরূপণ করার প্রয়োজন হয়। এই ক্ষেত্রে পরীক্ষা- নিরীক্ষা করার প্রয়োজন হয়। নব্জাতেকের জন্ডিস পরীক্ষা করে যদি দেখা যায় এটি বিপদের মাত্রা যদি নিচে থাকে,তাহলে আমরা সাধারণৎ বুকের দুধ খাওয়াতে বলি। বুকের দুধ হলো একমাত্র চিকিৎসা। আর যদি ফটোথেরাপি লেভেলে চলে যায়,তাহলে তাকে আলোর নিচে রেখে চিকিৎসা করা যেতে পারে।

 

পরীক্ষা করে যদি দেখা যায় এটি বিপদ মাত্রার নিচে থাকে, তাহলে আমরা সাধারণত বুকের দুধ খাওয়াতে বলি। বুকের দুধ হলো তার একমাত্র চিকিৎসা। আর যদি ফটোথেরাপি লেভেলে চলে যায়, তাহলে তাকে আলোর নিচে রেখে চিকিৎসা করতে হবে।

error: Alert: Content Copying is protected !!