কিডনির রোগের লক্ষণ, নির্ণয় ও চিকিৎসা।

kidneys filter wastes and excess fluids from your blood
কিডনি রোগ ভয়াবহ। ভয়াবহ বললে তো সবাই ভয় পেয়ে যায়। তবু বলি, এটা ভয়াবহই। কেন ভয়াবহ? এটা খুব প্রচলিত। আমাদের দেশে তাকালে দেখব, দুই কোটির বেশি লোক কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। ঘণ্টায় পাঁচজন মারা যায় কিডনি বিকল হয়ে। আর প্রতিবছর চল্লিশ হাজারের বেশি রোগীর কিডনি বিকল হয়ে মারা যায়। আবার যদি দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের কথা বলি, এটি কিন্তু ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। আমরা বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখেছি, বাংলাদেশে ১৬ থেকে ১৮ ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ রয়েছে। এগুলো সুপ্ত, ঘুমন্ত অবস্থায় রয়েছে।  রোগটি কতটা তীব্র, সে অনুযায়ী পাঁচটা ভাগে ভাগ করা হয়। এক, দুই, তিন, চার পর্যায়ে লক্ষণগুলো বোঝাই যায় না। কিডনি রোগের কারণে সে কিন্তু মারা যাচ্ছে না। তবে এর কারণে অন্যান্য রোগের আক্রমণ সাধারণের চেয়ে ২৯ গুণ বেশি হতে পারে। কাজেই যত রোগী কিডনি ফেইলিউর হয়ে মারা যাচ্ছে, এর চেয়ে অনেক বেশি মারা যায় হার্ট ফেইলিউর হয়ে। এ জাতীয় সমস্যা থেকে অন্য জটিলতা বেশি হয়। এই জন্য একে বলা হয় ‘ডিজিস মাল্টিপ্লায়ার’।

কিডনির নানান ধর নের রোগের লক্ষণ আলাদা আলাদা হয় , যার মধ্যে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি প্রধানত দেখা যায়:
  • সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে চোখ ফুলে যাওয়া।
  • মখ এবং পা ফুলে যাওয়া।
  • ক্ষুধামান্দ্য , বমি ভাব , দুর্বল ভাব।
  • বার বার প্রস্রাবের বেগ , বিশেষ করে রাত্রে।
  • কম বয়সে উচ্চ রক্তচাপ
  • শারীরিক দুর্বল ভাব , রক্ত ফ্যাকাসে হওয়া।
  • অল্প হাঁটার পরে, নি শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা তাড়াতাড়ি ক্লাস্তি অনুভব করা।
  • ৬ বছর বয়সের পরেও রাত্রে বিছানায় প্রস্রাব করা।
  • প্রস্রাব কম আসা ।
  • প্রস্রাব করার সময় জুলন অনুভব করা এবং প্রস্রাবে রক্ত বা পুজ-এর উপস্থিতি।
  • প্রস্রাব করার সময় কষ্ট হওয়া। ফোটা ফোটা করে প্রস্রাব হওয়া।
  • পেটের মধ্যে গিট হওয়া , পা আর কোমরের যন্ত্রণা।
উপরোক্ত লক্ষণগুলির মধ্যে কোনও একটি লক্ষণের উপস্থিতি থাকলে কিডনির রোগের সম্ভাবনা থাকতে পারে , এবং তৎক্ষণাৎ ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়ে চেক-আপ করানো দরকার।
কিডনির রোগের নির্ণয়।
কিডনির অনেক রোগ-চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। জটিল কিন্তু সম্পূর্ণ নিরাময় হয় না। দুর্ভাগ্যবশত অনেক গভীর কিডনির রোগের লক্ষণ শুরুতে কম দেখা যায়। এইজন্য যখনই কিডনির রোগের আশঙ্কা হয়, তখনই বিনা বিলম্বে ডাক্তারবাবর সঙ্গে পরামর্শ করে নির্ণয় এবং চিকিৎসা শুরু করা দরকার।
কিডনির পরীক্ষা কাদের করানোর দরকার? কিডনির রোগের সম্ভাবনা অধিক কখন ?
১. যে ব্যক্তির কিডনির রোগের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
২. ডায়াবিটস (মধুমেহ) রোগগ্রস্ত ব্যক্তি।
৩. উচ্চ-রক্তচাপযুক্ত ব্যক্তি (High Blood Pressure)
৪. পরিবারে বংশানুগতিক কিডনি রোগের ইতিহাস।
৫. অনেক দিন ধরে যন্ত্রণা নিবারক (Pain Killer Tablets) ঔষধের সেবন।
৬. রেচনতন্ত্রে জন্মগত রোগ
৭. ২-৫ বৎসর অন্তর নিয়মিত পরীক্ষা সাধারণের জন্য দরকার।
ক্রনিক কিডনি ডিসিজ এর রোগীদের কি কি খাদ্য পানীয়এর নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হয়।
ক্রনিক কিডনি ডিসিজ এর রোগীদের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য, কিডনির উপর বোঝ কম করার জন্য এবং শরীরে তরল এবং আয়ন এর নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য ডাক্তার বাবুর পরামর্শ মতো খাদ্য পানীয়য়ের নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। খাদ্য পানীয়র নিয়ন্ত্রনের সাধারণ পরামর্শ গুলি হলো:
  • উচ্চ রক্ত চাপযুক্ত রোগীদের লবন গ্রহন এর নিয়ন্ত্রণ।
  • শরীরে ফোলাভাব থাকলে তরল এবং জল গ্রহন কম করা।
  • পটাসিয়াম এবং ফসফরাস এর নিয়ন্ত্রণ।
  • ০.৮ মি.গ্রা. প্রতি কে.জি বডি ওএট বা তারও কম প্রোটিন গ্রহন।
  • শরীরে যথেষ্ট পরিমানে শর্করা, ভিটামিনস এবং ট্রেস এলিমেন্টস এর পরিপূরণ।

কিডনির রোগের নির্ণয়ের জন্য আবশ্যক পরীক্ষাগুলি হল ।

প্রস্রাবের পরীক্ষা
কিডনি রোগের নির্ণয়ের ক্ষেত্রে প্রস্রাব পরীক্ষা অতি প্রয়োজনীয়—
  • প্রস্রাবের পুজের (Pus) উপস্থিতি মূত্রনালিতে সংক্রমণের নিদর্শন।
  • প্রস্রাবের প্রোটিন বা রক্তকণিকার উপস্থিতি গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস এর নিদর্শন।
মাইক্রোঅ্যালবুমিনেবিয়া
প্রস্রাবের এই পরীক্ষাটি ডায়াবিটিসের কারণে কিডনি খারাপ হবার সম্ভাবনা থেকে সর্বপ্রথম এবং সবথেকে তাড়াতাড়ি নির্ণয়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
প্রস্রাবের অন্য পরীক্ষাগুলি হল
(১) প্রস্রাবের টি.বি.র জীবাণুর (Bacteria) পরীক্ষা টি.বি. নির্ণয়ের জন্য।
(২) ২৪ ঘণ্টার মূত্রে প্রোটিনের মাত্রা (কিডনির ফোলাভাব আর তার চিকিৎসার প্রভাব জানার জন্য)
(৩) প্রস্রাব কালচার আর সেনসিটিভিটি পরীক্ষা (প্রস্রাব সংক্রমণের জন্য দায়ী ব্যাকটিরিয়া বিষয়ে জানতে আর তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যাপারে জানতে)
প্রস্রাবের পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির বিভিন্ন রোগের ব্যাপার জানা যায় কিন্তু প্রস্রাব পরীক্ষার রিপোর্ট স্বাভাবিক (Normal) হওয়া সত্ত্বেও কডনিতে কোনও রোগ নেই সেটা বলা যায় না।
অন্যান্য পরীক্ষা : 
 কিছু বিশেষ প্রকার কিডনির রোগের জন্য ডপলার, রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা , ইন্ট্রাভেনাস পাইলোগ্রাফি (আইভিপি) , মিক্সইউরেটিং সিস্টোইরেথ্রোগ্রাম রেডিও নিউক্লিয়ার স্টাডি, রেনাল অ্যানজিওগ্রাফি, সি. টি. স্ক্যান, অ্যানটিগ্রেড আর রেট্রোগ্রেড পাইলোগ্রাফি ইত্যাদি পরীক্ষার দ্বারা নির্ণয় করা হয়।
ক্রনিক কিডনি ডিসিজ এর রোগীরা কেন অবশ্যই তরল গ্রহনের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখবেন।
কিডনি যেমন যেমন খারাপ হতে থাকে থেক একই ভাবে মুত্রের পরিমান কমতে থাকে. মুত্রের পরিমান কম হবার ফলে শরীরে তরলের পরিমান বাড়তে থাকে এবং মুখ, পা ফুলে যায়. রক্ত চাপও বেড়ে যায়. ফুসফুসে তরল জমা হবার ফলে স্বাস প্রশ্বাসে কষ্ট হয়. যদি ইহার চিকিত্সা না হয় তাহলে তা প্রাণ নাশক হতে পারে. এইসব সমস্যার থেকে মুক্তির জন্য তরল গ্রহনের উপর নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হয়
কোন কোন খাবারে লবন (সডিআম) বেশি থাকে।
পাপড়, আচার, আলু চিপস, চিনা বাদাম ইত্যাদি.
কোন কোন খাবারে পটাসিয়াম বেশি থাকে।
ফল, ফলের রস, ডাবের জল, শুকনো ফল ইত্যাদি.

এরপর যেটি আসে, সেটি হলো স্থূলতা। স্থূলতা যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের জন্য দায়ী, তেমনি এ থেকে ক্যানসারও হতে পারে; হাড়গুলো ক্ষয় হয়ে যায় এবং এটি সরাসরি কিডনির ছাঁকনি নষ্ট করে দেয়। কাজেই আমাদের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আমরা ব্যথার ওষুধ যত্রতত্র খাব না। এগুলো যদি আমরা এড়িয়ে চলতে পারি, তাহলে ভালো থাকতে পারি।

জন্মগত কিছু কিডনি রোগ হয়। বাচ্চাদের জন্মের পরপর পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত জন্মগত ত্রুটি রয়েছে কি না। একটু আলট্রাসনোগ্রাম করলে এগুলো বোঝা যায়।

error: Alert: Content Copying is protected !!