সাপ কামড়ালে আক্রান্তের উপরে কী করণীয় ও বর্জনীয়?

সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসার

সাপের বিষের বিষাক্ত উপাদানসমূহ স্নায়ুকোষকে আক্রমণ করে, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া প্রতিহত করে এবং পরিশেষে মানুষের মৃত্যু ঘটায়।  গোখরা, কেউটে, শঙ্খচূড় প্রভৃতি কোবরা শ্রেণির সাপের বিষে থাকে নিউরোটক্সিন নামক এক ধরনের রস যা স্নায়ুকে বিকল বা পঙ্গু করে দেয়। নিউরোটক্সিন দ্রুত কাজ করে, আর তাই এই শ্রেণির সাপের কামড়ে মৃত্যু দ্রুত হয়।

চন্দ্রবোড়া কিংবা ব্ল্যাটল সাপের দংশনে যন্ত্রণাবোধ হয়, দংশিত স্থানে জ্বালাপোড়া করে। চামড়া লালচে হয়ে ফুলে ওঠে, রক্তপাত হয়। চন্দ্রবোড়া হলো ভাইপার শ্রেণির সাপ। এই শ্রেণির সাপের বিষে প্রধানত থাকে হিমোটক্সিন রস, যার কাজ হলো রক্তকণিকা ভেঙে দেওয়া এবং রক্তপাত ঘটানো। এর ফলে রক্তবমি, রক্তপায়খানা ও রক্তপ্রস্রাব হতে পারে। হিমোটক্সিন ধীরে কাজ করে বলে এই শ্রেণির সাপের কামড়ে মৃত্যু ধীরে হয়।

নিম্নে সর্পদংশনের প্রাথমিক চিকিৎসার কতিপয় করণীয় ও বর্জনীয় কাজের তালিকা দেয়া হলো।

কী কী করণীয় ?

১. মনে রাখবেন, সাপে কাটলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। তাই রোগীকে ওই স্থানেই শুইয়ে দিন। রোগীর নড়াচড়া সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে, যাতে বিষ তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে না পড়ে।

২. সাপ যদি হাতে বা পায়ে কামড় দেয় তাহলে বাঁধন দিতে হবে। দংশিত স্থানের কিছুটা ওপরে দড়ি বা হাতের কাছে যা পান, তা দিয়েই বেঁধে ফেলুন। মনে রাখবেন বাঁধনটা যেন অস্থিসন্ধিতে যেমন কনুই, কবজি বা গোড়ালি এবং গলা বা মাথায় না হয়। যে দড়ি বা কাপড় দিয়ে বাঁধবেন তা যেন চওড়ায় দেড় ইঞ্চি হয়, কখনো তা যেন সরু সুতোর মতো বা রাবার ব্যান্ডের মতো না হয়। বাঁধনটি যেন খুব বেশি শক্ত না হয়। বাঁধনটি এমনভাবে দিতে হবে যেন একটা আঙুল ওই বাঁধনের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। যদি বাঁধনটি শক্ত হয়, তাহলে ঢিলা করে দেবেন, তবে কখনোই তা খুলে ফেলবেন না। বাঁধনটি দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো রক্ত চলাচল বন্ধ রাখা। তবে বাঁধনটি একটানা ২০ মিনিটের বেশি একভাবে রাখবেন না। প্রতি ১০ মিনিট অন্তর তা আলগা করে দিতে হবে।

৩. দংশিত স্থানটি পরিষ্কার পানি দিয়ে ধোবেন।

৪. এবার জীবাণুমুক্ত ছুরি বা ধারালো ব্লেড দিয়ে দংশিত স্থান দুটোর প্রত্যেকটি সতর্কভাবে ১ সে. মি. লম্বা এবং ১ মি. মি. গভীরভাবে চিরে দিতে হবে।

৫. চেরা স্থানে ছয় মিনিট মুখ দিয়ে চুষলে তিন-চতুর্থাংশ বিষ বেরিয়ে আসে। তবে ৩০ মিনিট চোষাই ভালো। মুখ দিয়ে চোষার ক্ষেত্রে যিনি চুষছেন তার মুখে কোনো ক্ষত থাকা চলবে না। চোষার জন্য রাবার বাল্ব কিংবা ইলেকট্রিক সাকার শ্রেয়।

৬. বিষ চুষে বের করার পর দংশন স্থানে আয়োডিন টিংচার, কিংবা স্পিরিট লাগাতে হবে। স্থানটিতে এসিড কিংবা ফুটন্ত তেল দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

৭. প্রাথমিক চিকিৎসার পর রোগীকে দ্রুত নিকটতম হাসপাতালে কিংবা স্থাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যেখানে অ্যান্টিভেনম সিরাম বা সর্পবিষনাশী সিরাম (যেমন হফকিনস পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম) মজুদ রয়েছে। প্রয়োজনে রোগীকে টিটেনাস বা ধনুষ্টঙ্কারের প্রতিষেধক দিতে হবে।

 

বর্জনীয় :  নিম্নলিখিত পাঁচটি পদক্ষেপ কখনওই করা উচিত নয়। জেনে নিন সেই পদক্ষেপগুলি কী কী ?

(১) আক্রান্ত স্থানের আগে ও পরে দুই বা ততধিক পট্টি শক্ত বাঁধা। কারণ এতে আক্রান্ত স্থানে রক্তের প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। এমনকি আক্রান্ত স্থানে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।

(২) আক্রান্ত স্থান ও এর চারপাশে ধারালো জিনিস দিয়ে চেরার মাধ্যমে বিষ ঝরানোর ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে অযাচিত রক্ত ঝরানো।

(৩) আক্রান্ত স্থানে চেরার মাধ্যমে রক্ত ঝরানোর পর তা মুখ বা মুরগির বাচ্চার পায়ুপথ (ক্লোয়াকা) দ্বারা চোষানো।

(৪) কোনো দহনকারক পদার্থ যথা- কার্বলিক এসিড দ্বারা আক্রান্ত স্থান পোড়ানো।

(৫) আক্রান্ত স্থানে বিষ শোষণকল্পে বিভিন্ন লতাগুল্মের লেই কিংবা গোবর বা কাদামাটি লাগানো। কারণ এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং আক্রান্ত স্থানে তা বিভিন্ন জীবাণুঘটিত জটিল সংক্রমণ তৈরি করতে পারে।

(৬) আক্রান্ত ব্যক্তিকে তেল, ঘি, গোলমচির কিংবা বিভিন্ন লতাগুল্মজাতীয় পদার্থ খাওয়ানোর মাধ্যমে বমি করানো।

(৭) আক্রান্ত স্থানে বিষ শোষণকল্পে পাথর, বীজ বা লালা প্রয়োগ করা।

কোনওরকম টোটকা বা কুসংস্কার নয়। সাপে কামড়ালে আক্রান্তকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিত্‍সকরা কিন্তু বলছেন, সাপে কামড়ানোর পরে ভয় পেয়ে এবং টোটকা প্রয়োগ করে সময় নষ্ট করতে গিয়েই মৃত্যুর সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

লখনউয়ের কিংগ জর্জ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির টক্সিকোলজি বিভাগের এক সহকারী অধ্যাপককে উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে কোনও বিষধর সাপই মানুষকে কামড়ানোর সময় খুব অল্প পরিমাণে বিষ ছাড়ে। ফলে, সাপে কামড়ালে কখনওই ভয় পাওয়া উচিত নয়।

 

error: Alert: Content Copying is protected !!